রাবি শিক্ষার্থী তাসিবের সাপের প্রতি ভালোবাসা

রাবি প্রতিনিধি।। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে লীলাভ‚মি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষা সংস্কৃতির পাশাপাশি নান্দনিকতা আর শৈল্পিকতার জন্য বেশ সুনাম রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির। ৭৫৩ একরে এক একটা বিকেল যেনো আলাদা হয়ে ধরা দেয় এখানকার শিক্ষার্থীদের কাছে। তেমনি এক বিকেলে ক্যাম্পাসে বন্ধুদের আড্ডা দি”িছলেন তাসিব। এমন সময় বেজে উঠলো তার ফোন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বেগম খালেদা জিয়া হলে একটি সাপ ঢুকে পড়েছে। খবর পাওয়া মাত্র সেখানে ছুটে যায় সে। রুমের জানালা ভেঙ্গে ধরেন সে সাপ। তারপর ছেড়ে দেন ক্যাম্পাসের নিরাপদ জায়গায়। শুধু খালেদা জিয়া হলই নয় ক্যাম্পাসের কোনো জায়গায় সাপের খবর পেলে সেখান হাজির হয় সে।

মিজানুর রহমান তাসিব রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী। ছোটবেলা থেকেই তার ছিলো প্রাণীদের প্রতি অগাধ ভালবাসা। সেই ভালোবাসা থেকেই প্রাণী সংরক্ষণ বিষয়ক সংগঠন ‘ডিপ ইকোলজি অ্যান্ড ¯œ্যাক রেসকিউ ফাউন্ডেশন’ নামক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হোন। বর্তমানে তিনি সংগঠনটির রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উইং হয়ে কাজ করছেন। ক্যাম্পাসে অনেকেই তাকে ‘সাপুড়ে তাসিব’ নামে ডাকে।

তাসিবের বেড়ে ওঠা ঢাকায়। ছোটবেলা থেকেই ছিলেন দুরত্ব স্বভাবের। সে সময় বিক্রমপুর, মুন্সীগঞ্জ, কেরাণীগঞ্জে মাছের চাষ হতো। মাছ ধরার জালে কোনো সাপ উঠলে টেনে হিচড়ে ছাড়ানো হতো। ফলে সাপগুলো আধমরা হয়ে যেতো। সেই সাপ নিয়ে খেলা করতো সে। ভয় লাগার ব্যাপারটা কখনো তার মধ্যে কাজ করতো না।

ক্যাম্পাসে সাপ ধরার (রেসকিউ) করার শুরুর গল্প সম্পর্কে মিজানুর রহমান বলেন, একদিন সন্ধ্যার দিকে পশ্চিমপাড়ায় ঘুরছিলাম। সে সময় চারটি বা”চাসহ একটি মেটো (মাইট্টা) সাপ রাস্তা পার হ”িছল। সেগুলো দেখার পর কয়েকজন মিলে সাপগুলোকে পিটিয়ে মারে। সেটা দেখে খুব কষ্ট পাই। তারা তো কোনো অপরাধ করেনি, কারো কোনো ক্ষতিও করেনি। তারপরও তাদেরকে পিটিয়ে মারা হলো। এটা দেখার পর সিদ্ধান্ত নিলাম এদেরকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। পরে বিভিন্ন ¯œ্যাক রেসকিউ গ্রæপে যুক্ত হই।

তিনি আরো বলেন, ক্যাম্পাসে কি ধরণের সাপ দেখা যায় সেটা জানার চেষ্টা করি। দেখা যায় ক্যাম্পাসে বেশির ভাগ সাপই হলো র্নিবিষ এবং মৃদু বিষধর। এদের কামড়ে তেমন ক্ষতির আশঙ্কা নেই। তবে কিছু গোখরা সাপও রয়েছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় প্রতিটি প্রাণীরই গুরুত্ব রয়েছে। ক্যাম্পাসে তাদেরকে নির্বিচারে না মেরে যেনো রক্ষা করা যায় সে লক্ষ্যে কাজ শুরু করি।

তাসিব বলেন, করোনা মহামারির কারণে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়। সে সময় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাপ রেসকিউ করার একটি আন-অফিসিয়াল ট্রেনিং পাই। সেখানে সব ধরনের সাপ ধরার প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।

করোনা মহামারির পর ক্যাম্পাসে হঠাৎ করে সাপের উপদ্রব বৃদ্ধি পায়। সাপ যাতে কেউ না মারে সেজন্য প্রত্যেকটি হলের গেটে একটি লিফলেট লাগিয়ে দেই। সেখানে আমার ফোন নম্বর দিয়ে দেই। এরপর প্রথম ফোন পাই বেগম খালেদা জিয়া হল থেকে। হলের ডাইনিং থেকে ঘরগিন্নী সাপ উদ্ধার করি। এরপর খালেদা জিয়া হল থেকে আরো একটি, চারুকলা থেকে একটি, মাদার বক্স হল ও তার সামনে থেকে দুটি, জোহা হলে শপিং ব্যাগ থেকে একটি, তাপসী রাবেয়া হল থেকে আরো একটি সাপ উদ্ধার করি। পরে তাদের ক্যাম্পাসের নিরাপদ জায়গায় ছেড়ে দেই।

তাসিন সবার উদ্দেশ্যে বলেন, সাপ মারতে গেলেও দংশনের আশংকা থাকে। তাই না মেরে আমাকে ফোন দিলে আমি এসে উদ্ধার করবো। ক্যাম্পাসের সবার কাছে আমার অনুরোধ সাপ দেখলে শুধু দূর খেয়াল রাখবেন কোথায় যায়। রেসকিউ করার দায়িত্ব আমার।

দেশে প্রথম সাপের বিষের ডাটাবেজ তৈরি করেছেন রাবির জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও বায়োটেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. আবু রেজা। তাসিনের কাজের প্রশংসা করে তিনি বলেন, এটি খুবই ভালো উদ্যোগ। দিনদিন সাপের সংখ্যা কমে যা”েছ। ক্যাম্পাসে যেগুলো আছে সেগুলোও ধ্বংসের দিকে। এদিকে শিক্ষার্থীদের সচেতন হওয়া দরকার। আমরা যদি সাপ না মেরে তাকে সহযোগিতা করি তাহলে ক্যাম্পাসের অনেক সাপ রক্ষা পাবে।

print

Share This:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

অন্যান্য নিউজ সমূহের শিরোনাম