খেতাবধন্য ক্যাপ্টেন তমিজ উদ্দিন প্রামানিক বীর বিক্রম

শৌর্য দীপ্ত সূর্য ।। তমিজ উদ্দিন প্রামানিক লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার তুষভান্ডার ইউনিয়নের সুন্দ্রাহবি গ্রামে ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সয়েফ উল্লাহ প্রামানিক, দাদার (পিতামহ) নাম সহর উল্লাহ প্রামানিক, মাতার নাম তমিজন নেছা এবং স্ত্রীর নাম রেজিয়া খাতুন।
তমিজ উদ্দিন ছোট বেলা থেকেই দুরন্ত স্বভাবের ছিলেন। তিনি অত্যন্ত সুঠাম দেহের অধিকারী ছিলেন। লেখাপড়ার চেয়ে তিনি খেলাধুলায় বেশী মনোযোগী ছিলেন। একজন ভাল ফুটবল খেলোয়ার হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় থেকে লোকজন এসে তাকে খেলতে নিয়ে যেতেন। পরবর্তীতে ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। তিনি তুষভান্ডার টাউন ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। একবার তাঁর দলের খেলোয়ারদের জার্সি কিনে দেয়ার জন্য টাকার অভাব হলে তিনি স্ত্রীর কানের সোনার দুল বিক্রি করে দেন। তিনি পরোপকারী ছিলেন। কারও বাড়ীতে আগুন লাগলে, কারও অসুখ বিসুখ হলে, কিংবা কারও বাড়ীর বিয়ে অনুষ্ঠানে সবার আগে তমিজ উদ্দিনকে দেখা যেত। তিনি এলাকার নি¤œবর্ণের হিন্দু মেয়েদেরকে সাহায্য তুলে বিয়ে দিতেন। ভাল খেলোয়ার এবং ভাল সংগঠক হবার কারণে সারাদেশের অনেক মানুষের সাথে তাঁর পরিচিতি ঘটে। তাদের আহবানে এবং ভ্রমণের প্রচন্ড নেশার কারণে তিনি মাঝে মাঝেই কলকাতা, ঢাকা, চট্টগ্রাম সহ বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতেন। কখনও কখনও তিনি পিতার ট্রাংক ভেঙ্গে টাকা নিয়ে দেশ ভ্রমণে যেতেন।
এত কিছুর মাঝেও ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে এক ধরণের একরোখা, আপোষহীন, প্রতিবাদী ও হেরে না যাওয়ার মানসিকতা লক্ষ্য করা যেত। তিনি কখনও হেরে যাননি। জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে তিনি এদেশকে রক্ষা করে গেছেন এবং জীবন উৎসর্গ করে তিনি আমাদেরকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। তাঁর জীবনের এ সকল বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পর পরই ২৭ মার্চ, ১৯৭১ সালে লালমনিরহাটে দু’জন শহীদ হওয়ার ঘটনায় তিনি গভীর দুঃখ পান। এ ঘটনা তাঁর মতো একজন বীরের পক্ষে মেনে নেয়া কষ্টকর ছিল। তিনি এ ঘটনার পরের দিনই কিছু যুবককে নিয়ে কাকিনায় একটি সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেন। তমিজ উদ্দিনের নেতৃত্বে এ সংগ্রাম পরিষদ কালীগঞ্জ থানার সকল অস্ত্র ও গোলাবারুদ জব্দ করে নেয়। এরপর অস্ত্রশস্ত্র সহ তিনি প্রশিক্ষণের জন্য ভারতের কোচবিহারের ট্রাঞ্জেন্ট ক্যাম্পে চলে যান এবং প্রশিক্ষণ শেষে একটি বাঙ্গালী মুক্তিযোদ্ধা দলের ক্যাপ্টেনের গুরু দায়িত্ব নিয়ে কুড়িগ্রাম জেলা শহরের পুরাতন হাইস্কুল মাঠে মুক্তিক্যাম্প স্থাপন করেন। কুড়িগ্রাম এবং লালমনিরহাট শহরকে পাক বাহিনীর আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য ১ এপ্রিল থেকে তিস্তা ব্রীজের পূর্ব পারে তমিজ উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যুহ গড়ে তোলা হয়। রংপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে পাক বাহিনী কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, কালীগঞ্জ ও হাতীবান্ধায় আক্রমণ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করছে সংবাদ পেয়ে মুক্তিযোদ্ধাগণ ২ এপ্রিল তিস্তা ব্রীজের পূর্ব পারে সর্তক অবস্থান নেয়। বিকের ৩ টায় পাক বাহিনী তিস্তা ব্রীজের পশ্চিম পারে অবস্থান নিয়ে হামলা চালায়। গোলাগুলির সময় পাকিস্তান সেনা বাহিনীর ক্যাপ্টেন আহাদ তিস্তা ব্রীজ অতিক্রম করার সময় মুক্তিযোদ্ধাগণের গুলিতে নিহত হয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে পরদিন পাকবাহিনী আবারও প্রচন্ড গোলাবর্ষণ শুরু করে। কিন্তু তারা তিস্তা ব্রীজের পূর্ব পার দখল করতে না পারায় বিকল্প পথে বিমান বাহিনীর সহায়তায় ৪ এপ্রিল সকাল ১১টায় ত্রিমাহিনী নদী অতিক্রম করে লালমনিরহাট বিমান ঘাঁটিতে অবস্থান নেয়। ফলে কৌশলগত ভাবে তমিজ উদ্দিন ও তাঁর দলের মুক্তিযোদ্ধাগণ তিস্তা ব্রীজের পূর্ব পারের ডিফেন্স ছেড়ে দিয়ে কুড়িগ্রামে আশ্রয় নেয়। সুবিধার কারণে ৫ এপ্রিল মুক্তিযোদ্ধোদের কুড়িগ্রাম হেড কোয়ার্টার নাগেশ্বরীতে স্থানান্তর করা হয়। এ সময় তমিজ উদ্দিন ও তার দল নাগেশ্বরীতে অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন স্থানে হামলা চালাতে থাকেন। পাক বাহিনী নাগেশ্বরী ও ভূরুঙ্গামারী দখলে নেয়ার জন্য ২৫ মে রাত থেকে প্রচন্ড আক্রমণ চালাতে থাকে। ২৬ মে তারিখ আক্রমণ তীব্র আকার ধারণ করলে তা প্রতিরোধ করার জন্য সুবেদার বোরহানের নেতৃত্বে বেশ কিছু মুক্তিযোদ্ধা ঘোগাদহ, পাটেশ্বরী এবং পাঁচগাছি এলাকায় অবস্থান নেন। কিন্তু অস্ত্র ও গোলাবারূদ কম থাকার কারণে এ প্রতিরক্ষা আস্তে আস্তে দুর্বল হয়ে পড়ে। এ সময় মুক্তিযোদ্ধারা নাগেশ্বরী হেড কোয়ার্টারে সাহায্য চেয়ে বার বার সংবাদ পাঠাতে থাকেন। যথা সময়ে সাহায্য না পাওয়ায় প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙ্গে যায় এবং মুক্তিযোদ্ধাগণ ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন। পরদিন ২৭ মে সকালে রায়গঞ্জ ও নাগেশ্বরী ঘাঁটি থেকে একদল ইপিআর কিছু গোলাবারূদ সহ সুবেদার বোরহানকে সাহায্য করার জন্য পাটেশ্বরীর দিকে অগ্রসর হন, অপর দিকে বিএসএফ -এর কাছ থেকে কিছু গোলাবারূদ এবং খাদ্য সংগ্রহ করে একটি জীপ সহ ১৯ জন মুক্তিযোদ্ধাবাহী একটি ট্রাক তাদের সাথে মিলিত হতে ধরলা নদীর দিকে অগ্রসর হয়। এ ট্রাকে ছিলেন ক্যাপ্টেন তমিজ উদ্দিন। এ সময় পাক বাহিনী ধরলা নদী পার হয়ে নাগেশ্বরীর দিকে এগিয়ে আসছিল। নাগেশ্বরীর তে-মাথার কাছে এসে জীপে অবস্থানকারী একজন মুক্তিযোদ্ধা বিষয়টি বুঝতে পারেন এবং সাথে সাথেই জীপ বাম দিকের কাঁচা রাস্তায় নামিয়ে দ্রæত ঘাঁটির দিকে ফিরে যান। কিন্তু পিছনে থাকা মুক্তিযোদ্ধাবাহী ট্রাকটি পাকবাহিনীর আক্রমণের মুখে পড়ে। পাক সেনারা ট্রাকটি লক্ষ্য করে গুলি বর্ষণ করতে থাকে। প্রচন্ড গুলি বর্ষণে ট্রাকটি উল্টে রাস্তার পশ্চিম পাশের গর্তে পড়ে যায়। তমিজ উদ্দিন তখন অস্ত্র সহ লাফিয়ে পড়েন এবং রাস্তার পাশে আহত অবস্থায় বীরত্বের সাথে সম্মুখ যুদ্ধ চালাতে থাকেন। কিছু সময়ের জন্য পাক বাহিনীকে প্রতিরোধ করেন এবং অনেক মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদ জায়গায় চলে যেতে সাহায্য করেন। এক পর্যায়ে তিনি পাক বাহিনীর গোলার আঘাতে শহীদ হন।
মুক্তিযুদ্ধে দেশের জন্য বীরত্বপূর্ন অবদান রাখার জন্য পরবর্তীতে তাঁকে ‘বীর বিক্রম’ উপাধি প্রদান করা হয়। কিছুদিন আগে তাঁর এ বীরত্ব গাথাকে অমর করে রাখার জন্য তুষভান্ডারের পূর্ব পাশে লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়ক থেকে তাঁর বাড়ি পর্যন্ত রাস্তাটির নামকরণ করা হয় ‘শহীদ ক্যাপ্টেন তমিজ উদ্দিন বীর বিক্রম সড়ক’।
শহীদ ক্যাপ্টেন তমিজ উদ্দিন বীর বিক্রমের কোন ছবি আজ সংগ্রহে নেই। ‘মৃত ব্যাক্তির ছবি রাখা যায় না’ মর্মে দাদীর কথা মান্য করে স্বাধীনতার পর পিতার ছবি পানিতে ফেলে দেন তমিজ উদ্দিনের বড় ছেলে মোঃ এফায়েতুল্লাহ। শহীদ তমিজ উদ্দিনের জীবিত ভাই, বোন ও ছেলে মেয়েদের ভাষ্য অনুযায়ী জানা যায় যে, শহীদ তমিজ উদ্দিন অত্যন্ত সুঠাম দেহের অধিকারী ছিলেন। তাঁর উচ্চতা ছিল প্রায় ৬ ফুট। গায়ের রং ছিল ফর্সা। চুল ছিল ছোট ও ঘন। নাক ছিল চোখা। নাকের প্রায় আধা ইঞ্চি ডান পাশে একটি বড় কালো তিল ছিল।

শহীদ ক্যাপ্টেন তমিজ উদ্দিন বীর বিক্রমের পারিবারিক পরিচয়:
শহীদ ক্যাপ্টেন তমিজ উদ্দিন বীর বিক্রম -এর ৩ ভাই ও ২ বোন ছিলেন। তারা হলেন-
১. মেহের আলী প্রামানিক
২. সুরতন নেছা
৩. শহীদ তমিজ উদ্দিন বীর বিক্রম
৪. মোঃ খয়ের উদ্দিন প্রামানিক
৫. মোছাঃ রাহেলা বেগম

শহীদ ক্যাপ্টেন ক্যাপ্টেন তমিজ উদ্দিন বীর বিক্রমের স্ত্রীর নাম রেজিয়া খাতুন। তাঁদের ৩ ছেলে ১ মেয়ে। তারা হলেন-
১. মোঃ এফায়েতুল্লাহ প্রামাণিক
২. মোঃ সিরাজুল ইসলাম প্রামানিক
৩. মোছাঃ রোকসানা বেগম
৪ . মোঃ আতিকুল ইসলাম প্রামাণিক।

——————–
শৌর্য দীপ্ত সূর্য
কলামিস্ট ও নাট্যকার
লালমনিরহাট

print

Share This:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

অন্যান্য নিউজ সমূহের শিরোনাম